মাহবুবা নাজমিন কাউখালী (পিরোজপুর) প্রতিনিধি:
বাবা দিনমজুরের কাজ করেন তাতেই চলে চার জনের সংসার। পরিবারের অভাব-অনটনকে জয় করেই প্রশান্ত মন্ডল নিজের স্থান করে নিয়েছেন মেডিকেলে ভর্তির মেধা তালিকায়। তার এমন সাফল্যে পরিবারে খুশির বন্যা বয়ে গেলেও তার মাঝেই ঊঁকি দিচ্ছে দুশ্চিন্তার পাহাড়।কোথায় পাবেন কলেজে ভর্তির টাকা? কীভাবে জোগাড় হবে পড়াশোনার খরচ? কেমনে মিটবে অন্যান্য ব্যয়? প্রশান্ত মন্ডল পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার চিরাপাড়া পারসাতুরিয়া ইউনিয়নের কেশরতা গ্রামের গৌরাঙ্গ লাল মন্ডলের পুত্র।জানাযায়, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় প্রশান্তর মা মারা যান। চার ভাই বোনের মধ্যে প্রশান্ত তৃতীয়। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে আর বড় ভাই সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ, পিরোজপুরে অনার্স পড়ছেন।সবার ছোট বোন দক্ষিণ নিলতী সম্মিলিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১০ শ্রেনীতে পড়ছে। প্রশান্তর মতন তার মেধাবী বড় ভাই ও ছোট বোনও প্রাইভেট পড়িয়ে তাদের পড়াশোনার খরচ চালাচ্ছেন।দিনমজুর বাবার টানাপোড়েনের সংসার। দিনমজুরির টাকা দিয়েই অতিকষ্টে চলে তাদের সংসার। অভাবের কারণে প্রশান্তর পড়াশোনার খরচ দিতে পারেননি বাবা। তবু দমে যাননি সে। শত কষ্টের মধ্যেও লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন তিনি।বাবা ও প্রতিবেশীর সঙ্গে দিনমজুরের কাজ ও প্রতিবেশী শিশুদের পড়িয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। ২০২১ সালে কাউখালীর দক্ষিণ নিলতী সম্মিলিত মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পান প্রশান্ত মন্ডল। মাধ্যমিক ভালো ফলের পর তিনি সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ, পিরোজপুর ভর্তির সুযোগ পান। সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজে ভর্তি হয়ে সে প্রতিদিন বাড়ি থেকে ১০ কিলোমিটার পথ বাইসাইকেল চালিয়ে কলেজে গিয়ে ক্লাস করতেন। কিন্তু দিনমজুর পিতার পক্ষে তার পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব না হওয়ায় সে কলেজের সহপাঠীদের প্রাইভেট পড়িয়ে পড়াশোনার খরচ চালিয়ে ২০২৩ সালে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পান। এইচএসসিতে ভালো ফলাফলের পর ওই বছরই সে মেডিকেলে ভর্তির জন্য চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। কিন্তু সে তার মায়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য মেডিকেলে ভর্তির হাল ছেড়ে না দিয়ে বাবার সঙ্গে দিনমজুরের কাজ ও প্রাইভেট পড়িয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নেয়। আর এবার মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরিক্ষায় অংশ গ্রহন করে মেধা তালিকায় ২৮৫২তম হয়ে তিনি শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ বগুড়া ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। প্রশান্ত মন্ডল বলেন, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার মা মারা যান। তার স্বপ্ন ছিল আমি চিকিৎসক হয়ে অসহায়, দুস্থ ও অবহেলিত মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখি।মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণের জন্য আমার লেখাপড়ার খরচ চালানো বাবার পক্ষে সম্ভব ছিলোনা। তাই নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারে সহযোগিতার জন্য আমি স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষার্থীদেরকে প্রাইভেট পড়ানোর পাশাপাশি বাবার সঙ্গে মাঠে শ্রমিকের কাজ করে পড়াশোনা করে এসএসসি ও এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েছি।এবার মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরিক্ষায় অংশ গ্রহন করে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু তার গরীব বাবার পক্ষে ভর্তির টাকা জোগাড় ও পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই মেডিকেলে ভর্তির টাকা জোগাড়ের জন্য প্রতিদিন বাড়ি থেকে পিরোজপুর গিয়ে প্রাইভেট পড়াচ্ছি। আর বন্ধের দিন বাবার সঙ্গে দিনমজুরের কাজ করছি।প্রশান্তর বাবা গৌরাঙ্গ লাল মন্ডল বলেন, বাবা হয়ে ছেলেকে কখনও তার পড়াশোনার খরচ আমি দিতে পারিনি। সে প্রাইভেট পড়িয়ে ও দিনমজুরের কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারে সহযোগিতা করেছে। ছেলে তার মায়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে আজ মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। তবে এখন নতুন চিন্তা ছেলের ভর্তিসহ পড়ালেখার খরচ জোগানের। কিভাবে কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। ছেলে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েও তাকে ভর্তি করাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। ছেলের স্বপ্ন পূরণের জন্য সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের সহযোগীতা চাচ্ছি।দক্ষিণ নিলতী সম্মিলিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক জাকিয়া আক্তার বলেন “প্রশান্তা মন্ডল অত্যন্ত মেধাবী। সে আমাদের স্কুল থেকে ২০২১ সালে এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়েছে।সে জেএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছিল। সে অভাব-অনটনসহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে লেখাপড়া চালিয়ে এবছর মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। সমাজের বৃত্তবানদের কাছে তার পড়াশোনার সহযোগিতা চাই।পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর পান্না লাল রায় বলেন, প্রশান্ত মন্ডল হতদরিদ্র একটি পরিবারে জন্ম নিয়েও মেধার সাক্ষর রেখে চলেছে।আমরা তাকে পড়াশোনার ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা করেছি। তার ফলাফলে আমরা গর্বিত এবং পরবর্তী জীবনের সফলতা কামনা করছি।কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা স্বজল মোল্লা বলেন, মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাওয়া অসচ্ছল পরিবারের সন্তান প্রশান্ত মন্ডলের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষে যতটুকু সহযোগিতা করার সুযোগ আছে, সেটা করা হবে।